ছোট গল্প
-

কথোপকথন
আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। তুমি কি রাজি? পাগল! নাকি মাথা খারাপ? এটা আমার প্রশ্নের জবাব হলো না। আপনার প্রশ্নের কোনো জবাব হয় না। তুমি রাজি কিনা! না। না? আমার চেয়ে যোগ্য পাত্র তুমি কোথায় পাবে? আমি পাত্র খুঁজে বেড়াচ্ছি এ-কথা আপনাকে কে বলল? বা রে! তোমার তো বিয়ে হয়নি। সব কুমারী মেয়েই পাত্র খুঁজে…
-

হাটুরে মারের এক পদ
গত শতকের পঞ্চাশ-দশকের ঢাকা শহর। তখনো মোহাম্মদপুর আর মিরপুর উপশহর তৈরি হয়নি। নিউ মার্কেট হয়েছিল। ধানমন্ডি উঠছিল। আশেপাশে নতুন নতুন জনপদও। তবু তখনো পুরনো ঢাকায় চলে প্রাদেশিক রাজধানীর বাজার-সদাই আর নানা কায়-কারবার। মানুষ যায় চকবাজার, মৌলভীবাজার, ইসলামপুর, আরমানিটোলা, উর্দু রোড, ইংলিশ রোড, লালবাগ, পাঁচ ভাই ঘাট লেন, মিটফোর্ড হাসপাতাল, নবাবপুর। জগন্নাথ কলেজ। জেলা কোর্ট। অথবা…
-

আক্কাস নিবাড়ন-কন্যা মর্নিং ডিউ লিপজেল মিস বাংলাদেশ
আক্কাস নিবাড়ন। নিবাড়ন অর্থ বাড়ন নেই যার। সোজা বাংলায় আক্কাস বামন। ফরিদপুরের বিল এলাকায় জোলা মুসলমান আর নমঃশূদ্রদের গ্রামে বামনকে নিবাড়নই বলে। আক্কাসরা চারপুরুষ ধরেই নিবাড়ন আর চারপুরুষ ধরেই সুদের ব্যবসা তাদের। আর সেই সুদের ব্যবসার টাকায় আক্কাসরা গত চারপুরুষ ধরে কিনে ফেলছে গ্রামকে গ্রাম জুড়ে যত ধানী-জমি, বিল, পুকুর কি মাঠ… সবই আক্কাসদের গর্ভে…
-

জিওল মাছ
কানাই কুণ্ডু জিরানিয়া পেরোতেই পাহাড় শুরু। বাঁশ বেত শাল সেগুন কলা কাঁঠালের ঠাসা জঙ্গল। পাহাড়ের কোলঘেঁষে সর্পিল পাকদণ্ডিতে আগরতলা-গুয়াহাটি হাই-ওয়ে। আট-দশ মিটারের ব্যবধানে রাইফেল, মেশিনগান কোলে ঝিমন্ত পুলিশ-মিলিটারি। তাদের সশস্ত্র অস্তিত্ব প্রমাণ করে অঞ্চলটি উপদ্রুত। খুন-জখম পণবন্দি প্রতিদিনের খবর। তেলিয়ামুড়া পেরিয়ে আঠারোমুড়া আর লঙতরাইয়ের মাঝে ছোট সমতল আমবাসা। হাট বাজার দোকান আড়ত। এই অঞ্চলেরই এক…
-

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অপ্রকাশিত ছোটগল্প
রচনা-পরিচয় স্বপন মজুমদার সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬০) গল্প লিখেছিলেন বেশ কয়েকটি, যদিও প্রকাশ করেননি একটিও। ১৯২৪-এর গোড়ার দিকে তিনটি গল্প পাওয়া যায় তাঁর খসড়া-খাতায় (এরই একটি Ñ ‘দুকূলহারা’- সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার বিভাব পত্রিকার বইমেলা সংখ্যায় [২৫:২, ফেব্রুয়ারি ২০০৪])। এই গল্পগুলির সংস্কার বা পরিমার্জনের পরিচয় আছে তাঁর পরবর্তীকালের পাণ্ডুলেখের মধ্যে। গল্প লেখার এই উৎসাহ সাময়িক উত্তেজনা…
-

স্বপ্নাবসান
অ্যাটর্নি অফিসের আবহাওয়ায়, ভাবভঙ্গি, আসবাবপত্র বা অভ্যাগতবৃন্দের মধ্যে এমন কিছু নেই যার সংস্পর্শে জেগে উঠতে পারে মেদুর-করুণ সুদূর অতীতের ছবি। দেবতাদের স্বাধিকারবোধ সম্ভবত খুব বেশি। একের আসরে অপরে আসতে চান না, বিশেষত আইনের অধিষ্ঠাত্রীর মন্দিরে স্বপ্ন-দেবীর আগমন অত্যন্ত বিরল। কিন্তু আজকে আমার ভাগ্যবিধাতা অন্যরূপ অভিরুচি করেছেন। এই চিরাভ্যস্ত আবেষ্টনে ও প্রতিবেশেও যে-স্মৃতি বাঁধা কর্মে অন্যমনা…
-

অশ্রু ও আগুনের নদী
‘হায় আল্লাহ…’ ‘চুপ কর হারামজাদা! তোর জিব আমি কেটে নেব।’ লোকটির লুঙ্গির সঙ্গে গোঁজা চল্লিশ হাজার টাকা টান দিয়ে কেড়ে নিল ইউসুফ। ‘হায় খোদা, আমার এক জোড়া গরু বেচার টাকা। আমার সর্বস্ব, আমি পথের ভিখিরি হয়ে যাব’ Ñ বলতে বলতে কাশেম ফুঁপিয়ে কেঁদে কেঁদে ইউসুফের হাত আঁকড়ে ধরল। সাপের মতো পেঁচিয়ে। নাছোড়বান্দা হয়ে। ইউসুফের পিস্তল…
-

কোকিল ডেকে যায়
মধু ভোরবেলা উঠে বউকে বলে, ‘বিদায় দে।’ মদিনা স্বামীর হাত ধরে কয়, ‘আজ লয়। কাল যাইয়ো।’ কড়ুই গাছের ডালে কোকিল ডেকে ওঠে। বসন্তের ভোরে কোকিলের ডাকের কী মানে হয় মধু জানে না। সে ফের শুয়ে পড়ে। আরামে নিদ্রা যায়। পরদিন ভোরে মধু আবার বউয়ের কাছে বিদায় চায়। বউ আবার বলে, আজ লয়, কাল। মধু সুবোধ…
-

হংসভাসীর তীরে
ইশ্কুলে যাবার পথে সেই বিষণ্ন রেললাইন, দুই সতীনের মতো পাশাপাশি অথচ গায়ে গায়ে চিরফারাক, গনগনে রোদ্দুর আর অসূয়া নিয়ে জাজ্বল্যমান সারা দিনমান, কঠিন হৃদয়হীন দুটো টানা ল¤¦া ইস্পাতের পাত। লাইনের হুই ওপারপানে ধাঙড়দের ঝুপড়ি, পোড়া কয়লার ডাঁই, নাকের পোঁটা বের করা ইল্লিবিল্লি কালো কালো ন্যাংটোপুঁটু আর গুমুতমাড়গোলানো বুঁদ গেরেম্ভারী বাতাস। সেই বাতাসের ক্বলিজা চিরে মাঝে…
-

অমলিন
বৈশাখি দুপুরের তপ্ত হাওয়ার মতো অস্বস্তি আর উদ্বেগ কমলাক্ষকে ঘিরে আছে। শুধু একটা মাত্র নাম। সেটুকু জানতে পারলেই স্বস্তির হিমেল স্পর্শ অনুভব করবে কমলাক্ষ। কিন্তু কেউই নামটা সঠিক জানাতে পারছে না। ম্যানেজমেন্ট ওইখানে রহস্যের গাঢ় পর্দা ঝুলিয়ে রেখেছে। নামটা জানার জন্য কমলাক্ষ চতুর্দিকে চর নামিয়ে দিয়েছে, এমন নয়। তবে আসন্ন অনুষ্ঠানের সঙ্গে যাঁরা কাজের সূত্রে…
-

সাদা কুকুর
ঢাকা আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের প্যাসেঞ্জার রিসিভিং করিডোর। নিজ নিজ যাত্রীর জন্যে অপেক্ষমাণ অন্যান্য মানুষের সঙ্গে অপেক্ষা করছে পাবনার সাধুপাড়ার দক্ষিণে কোশাখালি চর থেকে আসা দুজন মানুষ, একজন পুরুষ ও একজন মহিলা। সকলের অন্বেষণরত চোখ ভেতরের দিকে দেখার চেষ্টা করছে বিদেশবিভুঁই থেকে আসা আত্মীয়-পরিজনকে অথবা বন্ধুকে। কেউ কেউ ধোপদুরস্ত কাপড় পরে হাতে ইংরেজিতে অতিথির নাম লেখা ছোট…
-

স্বপ্ন
বেসমেন্টের অন্ধকার তখনো ভালো করে কাটেনি। কে জানে দিন কী রাত! রাতই হবে। যদিও মাটির তলার ঘর, কিন্তু খুদে একটা জানালা আছে। সেটা এ-বাড়ির বাগানের সঙ্গে সংযুক্ত। সুতরাং একটু হলেও আলো আসে। দেখা যায় কর্নারে একলা দাঁড়িয়ে-থাকা নাসপাতি গাছটা। শুধু একলা নয় দারুণ শীতে সবগুলো পাতা ঝরা ন্যাড়া ন্যাংটা। সামারে দুটো পাখির বাসা ছিল। কী…
