ছোট গল্প

  • পরীকাহিনি

    বদরুন নাহার পরীর গল্পটা আমি সাধারণত কাউকে বলি না। যদিও একদিন পরীর গল্পে হৃৎপিন্ডের সঞ্চালন বেড়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলাম! অনেকদিন বাদে আজ সে-গল্পকেই পুঁজি করে আমি যাচ্ছি আন্তর্জাতিক সেমিনারে। ল্যাপটপে সফট হয়ে যে-অক্ষরগুলো যাচ্ছে তা পরীকাহিনি। পরীর সঙ্গে আমার নিজেরও একটা গল্প আছে। সেটা আমার ভেতরের সফট কপি, ফাইলবন্দি। সেমিনারে আমি কেবল পরীর গল্পই বলব।…

  • পশমিনা

    বসন্ত লস্কর নীলের ওপর লাল গোলাপ ফুল অাঁকা টিনের তোরঙ, শাশুড়ির। বিয়ের কনের সঙ্গে এ-বাড়িতে ঢুকেছিল। গত বছর শাশুড়ি চলে যাওয়ার পর, দু-তিন মাস পরে ছোট ননদ লফট থেকে নামিয়েছিল। মরা মানুষের তোরঙ খুলে কেউ হাটকাচ্ছে, সে হোক না মানুষটির নিজের মেয়ে, দেখে রুমেলির ভালো লাগেনি। ননদকে বলতেই ননদ মুখঝামটা দিয়েছিল, ‘থামো তো তুমি, আমার…

  • কাকতালীয়

    বিকাশ কান্তি মিদ্যা কাকতালীয় ব্যাপারটা কেবল মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে, এমনটা ভাবার কোনো যুক্তি নেই। যদি কেবল মানুষের ক্ষেত্রে ঘটবে, তাহলে কাকতালীয় হবে কেন, বলুন? নিশ্চয়ই কাকের ক্ষেত্রে ঘটার সম্ভাবনা আছে, আছে বলেই নাকি, কাকিটা সেদিন সকাল সকাল উঠে, হাতের কাছে কিছু না পেয়ে, যখন কী খাই, কী খাই ডাকছিল, রতিকান্ত তরফদারের বাচ্চা মেয়েটা তখন টলমল…

  • মুখোমুখি

    মালেকা পারভীন বেডরুমের খাটের এক কোনায় বসে আছে সালমা। মুখটা কাঠিন্যের মুখোশে আটকে ফেলেছে সে। এতে করে তার অসচেতন অনিচ্ছায় যা ঘটেছে, তা হলো তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যের বলতে গেলে পুরোটাই ঢাকা পড়ে গেছে। যদি সে এখন আয়নায় তার আচমকা বদলে যাওয়া মুখের অাঁকাবাঁকা রেখাচিত্র দেখতে পেত, ঠিকঠিক সে নিজেই লজ্জা পেয়ে কাউকে কিছু বুঝে ওঠার…

  • রইস উদ্দিনের ফাঁসি

    মণীশ রায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে টবচর্চা করছিল দেয়া। বেশ কটি টব রয়েছে ওর দখিনমুখো ছোট বারান্দাজুড়ে। সবগুলোই গোলাপের চারা। বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে লতিয়ে উঠতে চাইছে। ফুটি-ফুটি করছে ফুল, তবু ফুটছে না বলে একবুক আক্ষেপ আর হতাশা নিয়ে এদের পরিচর্যা করে চলেছে সে। গাছেদের সঙ্গে দেয়ার বড় ভাব, গোপনে কথা বলে বিড়বিড় করে। রুম-লাগোয়া বারান্দা হওয়ায় গভীর…

  • দয়ালের বাড়িতে একটা ভিড় জমে ওঠে

    ঝর্না রহমান  জাইলা পাড়ায় দয়াল রাজবংশীর বাড়িতে একটা দুর্দান্ত ভিড় জমে ওঠে। আজ অবশ্য এ-সময় দয়াল রাজবংশীর বাড়িতে কোনো লোকসমাগমের কথা নয়। শুধু আজই বা কেন, দয়াল রাজবংশীর বাড়িতে কখনই লোকসমাগমের কথা নয়। যে-সমস্ত কারণে মানুষের বাড়িতে লোকজনের ভিড় জমে, যেমন জন্ম মৃত্যু বিয়ে অন্নপ্রাশন পূজাপার্বণ – ইত্যাদি উপলক্ষে আচার-অনুষ্ঠান – সে-সমস্ত কারণ এ-বাড়িতে একেবারে…

  • মুখোমুখি ব্রজনাথ

    মুর্শিদ এ এম জ্যামে আটকে পড়া বাস থেকে নেমে পড়লেন ব্রজনাথ। আরেকটু হলেই বাসটা চলতে শুরু করতে। গুঁতিয়ে-গাঁতিয়ে রিস্ক নিয়ে নামলেন। বাবুঘাট থেকে বসেই আসছিলেন। হেড অফিসে কয়েকদিন যাতায়াত করতে গিয়ে এই পথের পথিক। রোজই ভাবেন ব্রিজের ওপর গাড়ি স্লো হলে নেমে যাবেন। আজ করেই ফেললেন। সামনের গেট দিয়ে নামা ঠিক হয়নি – ভাবলেন তিনি।…

  • হিমচন্দ্রাতপে

    হিমচন্দ্রাতপে

    বারো ঘর এক উঠানের গল্প জানা আছে। উঠানের চারপাশে বারোটি ঘর, সেখানে বারোরকমের জীবন। কাঠ-পাতা কী কয়লার ধোঁয়ায় উঠান ঢাকা পড়ে, শলার ঝাড়ু হাতে যে যে যার যার অংশের পাতাকুটো পরিষ্কার করে যখন, তখনো ধূলিরাশিতে ঢাকা পড়ে। কিন্তু যা জানা নেই তা হচ্ছে, কখনো এই বারো ঘর থাকে না, এক উঠানও নয়। থাকে না ধোঁয়ার, কী ধূলিকণার রাশি। কালকাসুন্দির ঝোপ কী দণ্ডকলমের ঝাড়, থাকে না বেরাটির বেড়া কী তাতে ঝুলে থাকা তেলাকুচার লতা। সব, এইসব মোহনীয় চাঁদোয়ায় ঢাকা পড়ে, ছলকাতে থাকে হালকা ঢেউয়ের ডগায় রুপালি আলোয়, কোনো এক দিন। উঠানের একপাশে স্নানাগারটি, শৌচাগারও। বারোয়ারি। দেয়াল দিয়ে ঘেরা। তরল বর্জ্য দেয়ালের নিচের সরু পথে বেরিয়ে আসে, নালা দিয়ে বয়ে যায়, ক্রমে সেটি প্রসারিত হয়ে নরম মাটির উঠানের শেষ প্রান্তে এসে একটি ছোট জলাধারই হয় যেন। গাঢ় ছাইয়ের রং ও শ্যাওলার সবুজ জলাধারের মধ্যে মেশে এবং সেখানে বাড়িওলার আফ্রিকী মাগুর মাছটি ক্রমে হাঙরের চেহারা পায়। তবে ওই মাগুরটিও সেদিন থাকে না। চন্দ্রালোকে সে-ও হয় ছায়াহীন এবং ছায়াহীন হয় ঘর এবং উঠানও, কেবল গৃহশীর্ষ ছাড়া। দুই বড় রাস্তার দুপাশে শহরের চেহারা। শহরতলিই প্রায়। তবুও মূল শহরতলি ছাড়িয়ে, বিস্তীর্ণ মাঠ কী ইটভাটার সহস্র চিমনি পেরুলেই জনপদটি পড়ে। সবরকমের দোকানপাট, শহুরে জীবনের চেহারা দেখা যায়। জাতীয় সড়কের পাশেই নানা ব্যবসায়। সোয়েটার কী পোশাক তৈরির কারখানাও বেশ কটি। স্থানীয় কাঠের আসবাবপত্রের দোকানও আছে, ঢালাই লোহার আলমারি কী তারে ছাওয়া তৈজসপত্র রাখবার দেয়ালদানিসহ। অজস্র যানবাহন – দূরপাল্লার বাস, ছোট দৌড়ের মিনিবাস। শিল্পোপকরণ টানবার ট্রাক কী স্বল্পবিত্তের মাল টানাটানির ভ্যানগাড়িতে বাজারে ঢোকার মুখ সর্বদা বন্ধ যেন। সেটি পেরুলে, বাজারের মধ্য দিয়ে যাওয়া রাস্তার দুপাশে দাঁড়ানো থাকে রিকশার দল, এবং তারপর গ্রাম্য-পসারির অস্থায়ী দোকানপাট। কিছু এলোমেলো, অগোছালো স্থাপনার শেষে বাঁয়ে মোড় নিলে মনে হয় যেন জনপদের শেষ Ñ ফলা না-ফলা আম, জাম, কী পীতরাজের বাগান পার হয়ে। আছে বুঝি কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া কী দু-একটি শিমুলও; অসমান ভূমি, কিছু লালমাটির ঢিপি এবং শেষে পরিত্যক্ত ইটখোলার চৌবাচ্চা কী পরিখা। বারো উঠানের কেউ কেউ সেটিকে পুষ্করিণীও ঠাউরে নেয় কখনো। উঠানে যাওয়ার পথ আমবাগানের মধ্য দিয়ে। সরকারি পথ নয়, বেসরকারিও নয়। পায়ে চলার দাগই বলে সেটি পথ। পথের শেষে ইটের দেয়াল টিনের চালের বসতি। সেখানে ডাইনে মোড় নিলে পড়বে ঐ মৎস্যাধার। উলটোদিক থেকে আরেকটি নালা এসে ওই আধারে পড়ে বলে পারাপারের জন্যে ছোট একটি বাঁশের মাচা। সেটি পার হয়ে বাঁয়ে গেলে আবার কিছু ইট-টিনের ছাউনি এবং ঠিক সামনেই সেই চারপাশে বারোঘরের উঠান। উঠানের বাঁয়ে ইট-টিনের নতুন ছাউনি। ইটের দেয়াল দিয়ে ভাগ করা পাঁচটি খোপ, এক একটি ঘর। ঘরের ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় দোচালার টিন। সিলিং নেই Ñ বাঁশের মাচারও। ঘরকটির বাইরে টানা বারান্দা এখনো মাটির। ঘরের মেঝে মাজা সিমেন্টের হলেও, বারান্দা মাটিরই। টিনের চালা দিয়ে ঢেকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও আছে। বারান্দার দূর-মাথায় এক-দুধাপ নামলেই উঠানের শেষ Ñ সেখানে সাজানো পাঁচটি উনুন, মাটিতে গর্ত করে কাদা লেপে বানানো। কাঠকুটো, পাতা কী শুকনো ঘাস জ্বলে সেখানে, যখন যে জ্বালায়। উঠানের শেষ সীমানা বরাবর বাঁশ-কাঠের দোচালা Ñ বাড়িওলার রান্নাঘর। বাঁয়ে সামান্য তফাৎ করে আরো তিনটি বাঁশের বেড়া Ñ টিনের চালের ঘর। কাঠের জানালা বসানো। দিনমজুরের ঘর নয়, বোঝা যায়। বাড়িওলা ও তার দুই ভাই, প্রত্যেকেরই দুটি করে ঘর বলে শৌচাগারের পেছন দিকে ঘুরে এসেছে স্থাপনা। উঠানের বাঁপাশে একটি বেলগাছ, তার নিচে বাঁশের মাচা। রন্ধনক্লান্ত গৃহিণী শরীরের তাপ-নিবারণ কী সতীর্থদের সঙ্গে দিনের সংবাদ-বিনিময়কালে সেখানে বিশ্রাম করেন। কখনো কখনো চাঁদ-তারার রাত্রিতে দীর্ঘকাল ভিড় জমে যেন মাচার ওপরে এবং চারপাশে। উঠানের প্রায় মাঝখানে আছে একটি বাতাবিলেবুর গাছ। আকারে খুবই ছোট তার ফল, তবুও যখন ফলে তেল-মরিচের বাটি নিয়ে অনেকেই যায় তার নিচে। ঘরকটির পেছনে কিছু গাছ আছে। আম-কাঁঠাল হতে পারে। হতে পারে নিষ্ফল পীতরাজ এবং এই গাছের শ্রেণি পেরুলে শুধুই উঁচু-নিচু জমি। পতিত। ফসলের ক্ষেত নয়। ইটখোলার মাটিকাটা খানাখন্দে ভরা। দূরে একটি বাঁশবন। তারপরে ইতস্তত ছড়ানো ইটভাটার চিমনি কখনো আকাশে চোখ তুলতে দেয় না। নীলকালো ধোঁয়ার জন্যে। এই। এই হচ্ছে বারোঘরের উঠান। তিন…

  • গাও জিঙ্গজিয়ানের আত্মা পর্বত

    গাও জিঙ্গজিয়ানের আত্মা পর্বত

    সাম্প্রতিক কালে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত চীনা লেখক গাও জিঙ্গজিয়ানের উপন্যাস আত্মা পর্বত নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমি অগতানুগতিক বৈচিত্র্যময় শক্তিশালী সাহিত্যকর্ম। আত্মা পর্বতকে কোনো সুস্পষ্ট তালিকাভুক্ত অথবা খোপবন্দি করা কঠিন। সবচাইতে কাছাকাছি যে-সংজ্ঞা দেওয়া যায় তা হলো এই যে, আত্মা পর্বত একটি পিকারেস্ক উপন্যাস। এখানে আমরা পাই এক ব্যক্তির প্রায় উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণকাহিনী। এখানে প্রচুর আত্মজৈবনিক উপাদান…

  • স্বপ্নব্যাখ্যা-প্রকল্প

    স্বপ্নব্যাখ্যা-প্রকল্প

    কোনো পেশায় সুবিধা করতে না পেরে অবশেষে তারা তিনজন স্বপ্নব্যাখ্যা-বিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও এর কার্যপদ্ধতি, উদ্দেশ্য এবং ফলাফল নিয়ে পরস্পরে ব্যাপক মতপার্থক্য থেকেই যায়। তবে তারা প্রত্যেকেই তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, দূরদর্শিতা তথা মেধার ওপর পূর্ণ আস্থাশীল। সাদাফ সাইকিয়াট্রিস্ট, বয়স ত্রিশের কোঠা পার হতে-না-হতে এতদ্বিষয়ে তার বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া হয়ে গেছে।…

  • বাংলাদেশ

    বাংলাদেশ

    আউজকা বাসে ওটোনের সোম একটা আচানক বিত্তান্ত ঘটছে। আমি এই যে রিয়াজুল – আমি নাকচোখ খোলা রিয়াজুলে এক ট্যাপ খাইয়া গেছি – বিত্তান্তের গুণে। বিত্তান্তটা বিরাট কিছু না। কিন্তুক আমারে টাসকি খাওয়াইয়া দিছে। আতকা ঘটছে কিনা – টাসকি না খাইয়া যাই কই। নাইলে এই ত্রিয়েস্তে আছি আউজকা ধরতাছি পাঁচবছর যাইতাছে গা, নিয়মসিয়ম ভালাবুরা – এই…

  • সুখ-অসুখ

    সুখ-অসুখ

    অফিসে বসে সারাক্ষণই মনখারাপ করছিল অলীকের। এই বছর বিয়াল্লিশ বয়েসে এই মনখারাপ অনেকটা অসুখের মতো। বাড়িতে স্ত্রী সুরমা আছে, ছেলে রৌম্য আছে। বাড়িটিও নিজের তৈরি। বছর তিনেক হলো বানিয়েছে। মফস্বল শহরে সে থাকে। ডোমজুড়ে। অফিস কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে। সাততলা অফিসে, তার বসার চেয়ারটি জানালামুখো। শহরের বাড়ি আর অনেকটা আকাশ দেখতে পাওয়া যায়। এখন জুলাইয়ের একুশ,…