কবিতা
-
গাছ
এত হিংসা বিদ্বেষের কোন প্রয়োজন হতো এমন রক্তাক্ত ধারাপাত মানচিত্র জুড়ে! যদি মানুষেরা হতো শ্যামল-সবুজ বৃক্ষ বুকভরে তবে ছিল সজীব নিশ্বাস-স্বস্তি। বাগানে যখন দেখি পাতারা আনন্দে লুটোপুটি খায় যে-কোনো বাতাসে, ধর্মবর্ণপরিচয়হীন গাছপালা মানুষ হবে না। তবু গাছের স্বভাব যদি তাদের আত্মস্থ হতো – এমন আশায়হঠাৎ পাতার গন্ধে ভরে ওঠে আমার নির্জন সত্তা গহন রাত্রিতে।
-
মীরার ভজন
খঞ্জ ভিখিরির মতন আমি নিজে দু’হাত বাড়িয়েছি তোমার দিকদিশে; শূন্য পেয়ালায় দু’হাত রেখে, দ্যাখো, আমি কি আরো বেশি শূন্যতারই দিকে পাতিনি বারবার আমার দুটি হাত? খঞ্জ ভিখিরির মতন আগ্রহে দু’হাত বাড়িয়েছি তোমারই দিকে শুধু – আধুলি নয়তো বা একটি সিকি যেন তুল্য প্রতিমান! – তোমাকে দিতে পারি স্বপ্নমহলের সোনার চাবিকাঠি : বুকের খুব কাছে লুকোনো…
-
তুমি
তুমি উড়ে যাও মেঘের রাজ্যে তোমাকে যায় না ছোঁয়া তোমার শরীর পাখির পালক খড়ের আগুন অথবা শুভ্র ধোঁয়া। তোমাকে পুষছি পঁচিশ বছর ঘরের বিড়াল ফুলিয়ে রাখছ রোঁয়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে এঁটো কাঁটা খাও দুধের ভাণ্ডে থাবাটি বাড়াও চিতল কোরাল বোয়াল খেয়েছ সস্তায় কিনে আনছি কখনো মেঘনা নদীর পোয়া কাঁঠালের ভুতি খাও শুতি শুতি এখন চাইছ পাকা…
-
ফুলেরা একাকী কাঁদে
আমি তো ভ্রমর কিংবা প্রজাপতি নই যে, ফুল ফোটাবার জন্যে আমার অতো তাড়া থাকবে। কাজটা যতোই কঠিন হোক, তুমি তাকে মেনে নিয়েছো ভাগ্যলিখন বলে; গভীর তৃষ্ণা নিয়ে প্রতি পলে পান করছো নিজেরই স্বপ্নের মধ্যে গড়ে তোলা ফুলেদের আশ্চর্য মদিরা। একটুও বিস্মিত নই আমি তাতে। একা একা চিরকাল এই দৃশ্য দেখে দেখে ভ্রমরকে সঙ্গী করে উড়ে…
-
ভুল ছবি
এইসব দিলখোলা নির্মল হাসির আড়ালে নিঝুম গ্রীষ্মের মধ্যনিশাকালে তুমি কি দ্যাখনি দাঁত রক্তমাখা? মাস্তুলে নিশান হাঁড়-করোটি আঁকা – দেখে আমি গহীন গাঙে দিয়েছি ঝাঁপ নৌকার ছাদে ছায়ামূর্তি, প্রেতের আলাপ। কী জ্যোৎস্না, কী জ্যোৎস্না! মরি মরি বাগানে নেমেছে ঝাঁকে ঝাঁকে পরী বনের ওপাশে বাড়িতে নিগূঢ় উপাসনা ‘এমন রাত! হাওয়ায় উড়ছে যেন রুপাকণা’, এর চেয়ে বড় ভুল…
-
জীবন খুঁড়তে খুঁড়তে
এক ফোঁটা ঝরে অশ্রু চোখের, এক ফোঁটা আগুন আর এক ফোঁটা দিয়েছি তোমাকে বেদনামথিত করে বাকি কিছু নেই আমার জন্যে, শূন্য পিপাসা, শুকনো ত্বক, কি করে বলি জীবন মরুভূমি, তবু তো মরুতে বালির ঝড় – বুকটা খুঁড়ে আয়ু টেনে আনি তোমার মতো নিষ্ঠুর হই গাছপালা ছিঁড়ি, শেকড় বাকড় আরো বেশি ছিঁড়ে আনি আমাকে আর শিখিয়ো…
-
১৮ই শ্রাবণ
জন্মদিন এলে মনে পড়ে মৃত্যুদিবসের কথা : উজিয়ে তাবৎ ভ্রান্তি অমোঘ আসন্ন যথার্থতা আলো, গান, উৎসব : সবই মনে হয় অতিদীনা। দিন : সে তো রাত্রির ভূমিকা। তাই হাসতে পারি না। কান্নারও মানে নেই। রঙিন অথচ নিরঞ্জন দিনরাত্রিগুলি চলে যাচ্ছে একটি গাড়ির মতন। যাক। এভাবেই যায়। শুধু ওরা থাকে চোখ বুজে – ভুলে থাকতে চায়…
-
আমরা কেউ জানি না
তুমি ঘুম থেকে ওঠো কোন এক সকালে। ভাবো তোমার বয়স বেড়ে গেছে। ভাবো সকল পুরানো অর্থ বদলে গেছে। বদলে যাওয়া মানে তোমার ঘুম থেকে ওঠার সময় হয়েছে। এই বাড়িতে কেউ আমরা কারো নই। আমি আমার স্ত্রীর নই। আমি আমার ছেলের নই। আমরা একসঙ্গে থাকি। দূরের গাছপালা কারো নয়। দূরের পাখিগুলো কারো নয়। তবু সবকিছু শান্ত।…
-
শূন্যতা যখন পূর্ণ
আমার মায়ের মৃত্যুর পর কাতারে কাতারে লোক যখন সান্ত্বনা দিতে এল মুখ ফুটে একটিও কথা বলতে পারল না। দুয়েকজন মূর্খ সুপণ্ডিত এরই মধ্যে শাস্ত্র ছেনে স্তোকবাক্য সাজাতে গিয়ে স্মিত তোতলামি করলেন খুব, সে এক মহান বিড়ম্বনা। তাদের থামিয়ে দিতে গিয়ে ঘামে নেয়ে উঠি, আর অতঃপর অনর্গল আমি কথার ঝরনায় বাকি সকলের সন্তাপ জুড়িয়ে নিঃশব্দে গ্রহণ…
-
কিছু কি ঘটবে এরপরও
ক্ষমাহীন এ সময়ে অভিশাপ ছিল তাই সমূহ জুলুম, এ পাড়া নিষিক্ত রক্তে। দীর্ঘকাল পলাতক ঘুম। খুব প্রতীক্ষায় ছিল মানুষেরা, এ পাড়া-ও পাড়া, আসলে কী হলো, সাইনবোর্ড পাল্টে ফেলা ছাড়া! নিয়তি নির্দিষ্ট যেন কোনোকালে পাল্টাবার নয় শুধু কাটবে না এই হতচ্ছাড়া জনতার ভয়। আমাদের চারপাশে বিষণ্নতা, আক্রান্তের মুখ, না বলা কথার চাপে ভারাক্রান্ত, জটিল অসুখ। দিন…
-
মনের মণিপুরে
এবার মনের মণিপুরে চলো রাসনৃত্যে; ওখানে পূর্ণিমা অঘ্রানের ধ্যানী মাঠে-মাঠে ফেলেছে সবুজ শামিয়ানা। মৈতেই ভাষার সদানন্দ বোষ্ণব-বোষ্ণবী আজ শ্রেষ্ঠ আনন্দের স্মিত নদীবক্ষে মাইবা আর মাইবির মতো কাঁপতে-কাঁপতে চলে শিউলিঝরা ভোরের দিকে; নাঙা শরীরে ওদের লাই হারাউবা জ্বর! গ্রাম-গ্রামান্তর চষে এনেছে সজল সাজিভরা ফুলের বাগান – ওদের রূপের…
-
কৃষ্ণবিবর
অপরূপ তুমি নও, ছিলে না কখনও, তবু ছিল রূপ এখন ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে কঙ্কাল স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার উগরে দিচ্ছে আধিভৌতিক ভীতি দেখ, ধরিত্রী তাকিয়ে আছে তার সন্ততির দিকে শূন্যমেঘ আকাশের নির্জনতা বড় বেশি বাক্সময় সময় স্তব্ধ নয়, তবু স্তব্ধতার কাছে নতজানু জলার ওপার থেকে মৃত্যু ভেসে আসে ফড়িঙের ডানায় কালাকাল জেগে থাকে – আলো খোঁজে,…
