জাকির তালুকদার
-

মৃত্যুযাত্রা
চাঁদটাকে মাঠের ঠিক মাঝখানে এইভাবে গা এলিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে সে এতটাই ধাক্কা খায় যে তার তেমন অবাক হওয়ার কথাও আর মনে থাকে না। এতক্ষণ সে আকাশে চাঁদের অবস্থান দেখে দেখে দিক ঠিক করে পথ চলছিল। এই তো মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে সিগারেট ধরানোর জন্য চাঁদ আর রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠিটার দিকে…
-

বিক্ষত দিনের কথকতা
‘ইতিহাসে ন্যায়বিচার নেই। তবে ন্যায়বিচারের জন্য যুদ্ধ আছে। তার মূল্য কম নয়।’ [ইয়ুভাল নোয়াহ হারারি] ‘হৃষ্ট, তুষ্ট, খুশি – এমন লোক লিখতেই জানে না। বাস্তব দশাকে যে মেনে নেয়, তাতে যে সায় দেয়, সে যেন কখনো ভাষার বাস্তবতাকে উদ্ভাবন করে নেবার উচ্চাশা না করে। সাহিত্যের উৎকাক্সক্ষা জন্মায় শুধু তখনই, যখন মানুষ জগতের দশা দেখে অসন্তোষে…
-

অবচেতনের সহোদরা
[৪৮ বছর মনের ওপর পলেস্তারা পড়ার মতো যথেষ্ট সময় বলে যখন মনে হতে থাকে, ঠিক তখনি একজন বোনের আর্তি হুড়মুড় করে ধসিয়ে দেয় ভুলে-যাওয়া দেয়ালগুলোকে। আর মানুষ তখন পুরোপুরি ফিরে যায় ৪৮ বছর আগে।] মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ১৭ বছর হলে এখন ৬৫। কিন্তু গোলাম রসুলকে দেখলে কেউ তার বয়সের কথা ধারণাই করতে পারবে না।…
-

মৃত্যুযাত্রা
চাঁদটাকে মাঠের ঠিক মাঝখানে এভাবে গা এলিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে সে এতটাই ধাক্কা খায় যে, তার তেমন অবাক হওয়ার কথাও আর মনে থাকে না। এতক্ষণ সে আকাশে চাঁদের অবস্থান দেখে দেখে দিক ঠিক করে পথ চলছিল। এই তো মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে সিগারেট ধরানোর জন্য চাঁদ আর রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠিটার দিকে…
-

শওকত আলী : পথিকৃৎ লেখকের প্রতিকৃতি
জাকির তালুকদার নিজের সাহিত্যিক লক্ষ্য থেকে কখনো বিচ্যুত হননি শওকত আলী। প্রগতিশীল সাহিত্য ও সমাজচিমত্মা তাঁর ভেতরে প্রজ্বালিত রেখেছে পথচলার আলোকশিখা। তাই কখনো পথভ্রষ্ট হননি তিনি। বিভিন্ন সময় কলাকৈবল্যবাদ আক্রমণ শানিয়েছে বাংলাদেশের সাহিত্য-অঙ্গনে। সেই কুহকে বেপথু হয়েছেন অনেকে; কিন্তু নিজের জায়গা থেকে নড়েননি শওকত আলী। নিজের সাহিত্যদর্শনকে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। পর্যালোচনা এবং নির্মম আত্মসমালোচনায় কখনো…
-
গড়শ্রীখণ্ড ও অমিয়ভূষণ
ক. প্রাক-প্রসঙ্গ মহামানবদের কিছু কিছু উক্তি কখনো কখনো ভুলে যাওয়াই ভালো। যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দুজন মহামানব গড় শ্রীখণ্ড সম্পর্কে যে-দুটি মন্তব্য করেছিলেন, সে-দুটি পাশাপাশি রাখলে গড় শ্রীখণ্ড না-পড়া পাঠক হকচকিয়ে যাবেন। উক্তিদুটি তুলে ধরা যাক। প্রথম উক্তি রাজশেখর বসুর। তিনি গড় শ্রীখণ্ড-প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘কি ভাষা! পড়া যায় না।’ অন্যদিকে পূর্বাশা-সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য ১৩৬০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় সার্টিফিকেট দিচ্ছেন এই বলে, ‘তরুণ কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অমিয়ভূষণ মজুমদারই এমন একজন লেখক যিনি বহুবিধ কোণ থেকে জীবনকে দেখতে জানেন।… গড় শ্রীখণ্ড তাঁর প্রথম উপন্যাস। আমাদের আশা আছে এ-রচনাটি তাঁকে বাংলা উপন্যাসের আসরে সম্মানের আসন দান করবে।’ অতএব আমাদের আপাতত দেরিদাপন্থি হওয়াই ভালো। কে লিখেছেন, সেই লেখা সম্পর্কে কে কী বলেছেন Ñ এসব নিয়ে না ভেবে সরাসরি টেক্সটে প্রবেশের যে-প্রস্তাবনা জাক দেরিদা করেছিলেন, সেটি মেনে চলতে পারলে মনে হয় ভালোই হতো। কিন্তু পুরোপুরি মেনে চলা কোনো পাঠকের পক্ষেই সম্ভব নয়। আরেকটি জরুরি কথা। বলা হয়ে থাকে যে, অমিয়ভূষণ ছিলেন প্রচারবিমুখ, নিভৃতচারী। হয়তো তাঁর প্রথম জীবন সম্পর্কে কথাগুলো খাটে। কিন্তু শেষ জীবনে তিনি এসেছিলেন আলোকবৃত্তের একেবারে কেন্দ্রে। নিজের সম্পর্কে কথাবার্তা বলেছেন ও লিখেছেন প্রচুর। কাজেই অমিয়ভূষণের জবানি দিয়েই কিংবা তাঁর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেই ধাপে ধাপে তাঁর রচনাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। গড় শ্রীখণ্ড-প্রসঙ্গেও এ-কথা সমভাবে প্রযোজ্য।সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অমিয়ভূষণের উপন্যাস, গল্প তথা অমিয়ভূষণ-লিখিত যে-কোনো রচনাকেই ক্লাসিক বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একশ্রেণির সমালোচক এবং আকাশে নাক বেঁধে রাখা বোদ্ধাপাঠক (!) অমিয়ভূষণের লেখায় যে-অসংগতি থাকতে পারে, তা মেনে নিতে রাজি নন। কোন কোন গুণের সন্নিবেশ ঘটলে কোনো রচনা ক্লাসিকত্বপ্রাপ্ত হয়, তা এই নিবন্ধকারের কাছে পরিষ্কার নয় বিধায় এই রচনাটিতে ‘উক্ত’ শব্দ প্রযোজ্য হবে না। মনে রাখা দরকার, ক্লাসিক উপাধি ছাড়াই অনেক সাহিত্য ‘উৎকৃষ্ট সাহিত্য’ বলে পরিগণিত হতে পারে। ব্যক্তিগত সমীক্ষায় দেখা গেছে, অমিয়ভূষণের গুণমুগ্ধ ভক্তের সংখ্যা যতটা, অভিনিবেশী পাঠকের সংখ্যা তার চাইতে ঢের কম। তাঁর গুণমুগ্ধরা তাঁর রচনার চাইতে সাক্ষাৎকার, মন্তব্য ও সমালোচনা পড়েই অমিয়ভূষণের অন্ধ স্তাবকতা করে থাকেন। এই রকম কিছু স্তাবকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, ‘আমাদের একপাশে সোশ্যাল রিয়ালিজম আর অন্যপাশে দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক স্ট্রিম অব কনসাসনেসের চোরাপাহাড়। এই দুটি থেকে অব্যাহতি কামনা করেছিলেন তিনি। তাহলে অন্তত পাঠক হিসেবে রিলিফ পাওয়া যায়। অমিয়ভূষণে এই রিলিফ মিলবে না। বিশেষত স্ট্রিম অব কনশাসনেসের ব্যবহারে নিজের সিদ্ধি নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত ছিলেন তিনি। সুতরাং চোরাপাহাড়ে পথ রুদ্ধ দেখলে পাঠকের হতবাক না হওয়াই উচিত।’ খ. উপন্যাস বলতে অমিয়ভূষণ নিজে কী বুঝতেন বা বোঝাতে চাইতেন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত উত্তরাধিকার পত্রিকার অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৯৪ সংখ্যায় প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে অমিয়ভূষণ বলেছিলেন, ‘আমি শেষের কবিতাকে উপন্যাস মনে করি না। উপন্যাস ও-জিনিস নয়। গোরা, ঘরে বাইরে, চতুরঙ্গ Ñ এগুলোকে আমি উপন্যাস বলি। নৌকাডুবিকেও বলি। কিন্তু চোখের বালি Ñ তাকে উপন্যাস বলি না।’ তাহলে তিনি কাকে বলছেন উপন্যাস? এ-বিষয়ে তাঁর নিজেরই একটি প্রবন্ধ রয়েছে। নাম ‘উপন্যাস সম্বন্ধে’। আমরা যদি সেই প্রবন্ধের দ্বারস্থ হই, তাহলে কিছুটা সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, উপন্যাস সম্পর্কে ধারণা স্বচ্ছ হলে অনেক সমস্যা কেটে যায়। তবে মনে রাখা দরকার, কেউ কোনোদিন কোনো শিল্প সম্পর্কে জলবৎ তরলং স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারেনি। পুরো প্রবন্ধ আদ্যোপান্ত পাঠ করার পরে স্বীকার করতে পাঠক বাধ্য হন যে, অমিয়ভূষণও ‘উপন্যাস সম্বন্ধে’ কোনো স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারেননি। ওই প্রবন্ধে উপন্যাস কী Ñ তা না বলে তিনি মূলত বলতে চেয়েছেন কী কী আসলে উপন্যাস নয়। যেমন, সাধারণ প্রচলিত মত হচ্ছে, নরনারীর নামযুক্ত ঘটনাবলিকেই উপন্যাস বলা হয়ে থাকে। অমিয়ভূষণ এই সরলীকৃত সংজ্ঞাকে বিদ্রƒপ করেছেন তীক্ষèভাবে। প্রবন্ধে আরেকটি সরলীকৃত ধারণাকেও তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। পূর্বসূরি একজন সাহিত্যতাত্ত্বিক উপন্যাসকে পোর্টম্যান্টোর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, অর্থাৎ এতে, পোর্টম্যান্টোতে যেমন, তোমার সবকিছু রাখতে পারো…
