শিল্পী সাঈদা কামালের জলরং-প্রদর্শনী শুরু হয় ধানমন্ডি চিত্রক আর্ট গ্যালারিতে ২০ আগস্ট ২০০৪। উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। সাঈদার প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন শহরে ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৪ সালে ঢাকায় দৃক পিকচার লাইব্রেরিতে এবং ১৯৯৯ সালে জার্মানির হামবুর্গ শহরে।
আলোচিত তাঁর চতুর্থ একক প্রদর্শনীতে মোট ৭৬টি জলরঙের ছবি স্থান পেয়েছে। শিল্পী এই প্রদর্শনীর নাম দিয়েছেন কাছে-দূরে। হতে পারে তিনি অতীত-বর্তমান কিংবা দেশ-বিদেশকে মনে রেখে এই নাম দিয়েছেন।
সাঈদা কামালের (টুলু) পরিবার বাংলাদেশের গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী। একসময়ে ‘সাঁঝের মায়া’ হয়ে ওঠে এদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং নারীবাদী-আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর সাহসিকা মাতা সুফিয়া কামাল ছিলেন এসব আন্দোলন-অনুষ্ঠানের শীর্ষস্থানে। প্রচারবিমুখ পিতা কামালউদ্দীন খান ছিলেন মুক্তচিন্তার পূজারী একজন সুপণ্ডিত ব্যক্তি। তাঁদের তারাবাগের সবুজ গাছপালাঘেরা পুকুর-সংলগ্ন বাড়িটি ছিল নৈসর্গিক দৃশ্যে মনোহর। সাঈদা কামালের অর্থাৎ আমাদের টুলুর মানস তৈরি হয় এই সামাজিক এবং নৈসর্গিক পরিবেশে। সৌন্দর্য-চেতনা এবং রুচিবোধ তাঁর রক্তে প্রবাহিত। ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার দিকে তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রভাবে তাঁর নিজের মধ্যে এমন একটি শক্তির স্ফুরণ ঘটে, যা তাঁর আঁকার আকাক্সক্ষাকে উদ্বোধিত করে, অনুপ্রাণিত করে। তিনি ছবি আঁকার দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ১৯৭২ সালে ইনস্টিটিউট অফ ফাইন আর্টস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে বি এফ এ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে শান্তিনিকেতন, বস্টন, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন স্টুডিও সেন্টার থেকে শিল্পকলায় উন্নতমানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।শিল্পকর্মের জন্য গভীর আত্মবিশ্বাস এবং একাগ্রতা নিয়ে তিনি জলরংকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে অবিচল রয়েছেন এই শিল্পধারায়।
আমি শিল্প-সমালোচক নই। শিল্পকর্মের ব্যাকরণও বিশেষ জানি না। দেশ-বিভাগের আগেই (১৯৪৫) আমি কলকাতা থেকে কামরুল হাসান, খালেদ চৌধুরী, খাজা শফিক আহমদ, হাবিবুল্লা খান প্রমুখ শিল্পীকে দিয়ে চট্টগ্রামে আমাদের খুরশীদ মহল সিনেমা হলে বেশকিছু চিত্র অঙ্কন করিয়েছিলাম। তাঁরা সবাই তখন কলকাতা আর্ট কলেজের ছাত্র। চট্টগ্রামে তাঁদের সঙ্গে খুব আনন্দে দিন কাটিয়েছিলাম। আর আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের জলরঙে আঁকা ছবি অত্যন্ত কাছে থেকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছিলাম। তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে কলকাতায় যামিনীরায়সহ বহু গুণী শিল্পীর শিল্পকর্ম দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। আরো সৌভাগ্য হয়েছিল বহু শিল্পপ্রদর্শনী দেখার। এভাবে শিল্প-বিষয়ে আমার দৃষ্টিকে সৌন্দর্যবোধে আলোকিত করার চেষ্টা করি। সম্ভবত এই কারণেই আমি শিল্পকর্মের গুণাগুণ-বিচারে আমার ভালোলাগাকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকি। যেমন শাস্ত্রীয় সংগীতে ব্যাকরণ না জেনেও একজন শ্রোতা অবিরত এ-সংগীত শুনে শুনে তার কানকে তৈরি করেন, সেভাবে শিল্পকর্ম দেখে দেখে আমি আমার চোখকে তৈরি করেছি।
এই চোখ দিয়ে আমি টুলুর শিল্পকর্ম দেখেছি, ভালো লেগেছে, মুগ্ধ হয়েছি। এবং মনে হয়েছে তিনি আমাদের শিল্পভুবনে নিজের জন্য একটি বিশিষ্ট স্থান করে নিয়েছেন। ধ্বনি, রং এবং আবেগের সংমিশ্রণে তিনি তৈরি করেন তাঁর শিল্পকর্ম।
শিল্পবোদ্ধাদের কাছে শুনেছি জলরঙের কাজ যতটা সহজ বলে মনে হয়, ততটা সহজ নয়। এই মাধ্যম অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয় সংযম, নিষ্ঠা এবং রং-নির্বাচনে পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়ে। আমরা যা খালি চোখে দেখি তার সবটাই আঁকা যায় না। অবিকলও আঁকা যায় না। তাই আর্ট কখনো মৌলিক বস্তুর বাস্তব প্রতিফলন হয়ে ওঠে না। এই গ্রহণ-বর্জনের খেলায় শিল্পীকে খুবই সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হয়। আর্ট ফটোগ্রাফি নয়। যদিও বর্তমানে ফটোগ্রাফিও আর্ট-অভিধায় নন্দিত হয়। কোনটি রাখব, কোনটি বাদ দেবো, কোন বস্তুর জন্য কোন রং ব্যবহার করব – এই নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় যিনি পারদর্শিতার পরিচয় দিতে পারেন, তিনি হয়ে ওঠেন সার্থক শিল্পী। এখানেই একজন ড্রইং-শিক্ষকের সঙ্গে একজন শিল্পীর মূল পার্থক্য। ড্রইং-শিক্ষকের কাক আর জয়নুল আবেদিনের কাক কখনো এক হয়ে ওঠে না। সার্থক শিল্পকর্ম প্রাণবন্ত হয়ে দর্শকের সঙ্গে কথা বলে। মানুষের মনে জাদু-বিস্তার করে। তাতে থাকে রং, ভাষা, ধ্বনি, সুর, ছন্দ, মাত্রা, আবেগ। এই বিচারে টুলুর কোনো কোনো ছবি আমার কাছে জীবন্ত এবং বহুমাত্রিক মনে হয়েছে।
আমাদের সমাজে পেশা হিসেবে শিল্পকর্মকে বেছে নেওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বিশেষ করে তিনি যদি হন নারী-শিল্পী। আমরা যাদের শিল্পের ফনিস্যার বলে থাকি তাঁরা এখনো এদেশে পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। শিল্পের পেছনে বিত্তবানশ্রেণি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই বললেই চলে। তার উপর তো রয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদী আক্রমণ। শিল্পের উৎকর্ষের জন্য শিল্পীর যে-ধরনের স্বাধীনতা প্রয়োজন, আমাদের সমাজে তার অভাব রয়েছে। এসব অসুবিধা সত্ত্বেও ঢাকায় গড়ে উঠেছে বেশকিছু আর্ট গ্যালারি। শত হতাশার মধ্যেও আর্টপ্রেমীদের জন্য এটি একটি সুসংবাদ। পরিতাপের বিষয়, চারুকলাকে জনঘনিষ্ঠ করার জন্য এখনো পর্যন্ত আর্ট-সম্পর্কিত কোনো উচ্চমানের সাময়িকী প্রকাশিত হয়নি। আর্ট গ্যালারির পরিচালকরা সম্মিলিতভাবে যদি এ-ব্যাপারে উদ্যোগ নেন, তবে এর সুফল সবাই ভোগ করবেন।
আমাদের দেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অবারিত মাঠ, ঢেউতোলা শস্যের সমুদ্র, শান্ত নদী, ধু-ধু চর, কাশবন, আকাশ, মেঘ, নৌকা, গাছ, ফুল, পাখি টুলুর চিত্রকর্মকে রঙে ও রেখায় সমৃদ্ধ করেছে। এ-ছাড়া বস্টন, জার্মানি, ভারমন্টে থাকাকালীন সময়ে শিল্পীর আঁকা ও দেশের কিছু চিত্র প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, যাতে রয়েছে দেশের পুরানো ধাঁচের বাড়ি, নৌকা, গোধূলির আলোয় স্নাত রমণীর অঙ্গ-সৌষ্ঠব। নিঃসন্দেহে ভালো কাজ।
কিন্তু বাংলাদেশের যেসব দুর্যোগপূর্ণ প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের বসবাস, সেই বজ্র-বিদ্যুতে ভরা তীব্র বর্ষণমুখর আকাশ, দুরন্ত প্রমত্তা নদী, প্রলয়ঙ্করী ঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, মাঠফাটা খরা, দুর্বিনীত বন্যা – এসব শিল্পীর কর্মে অনুপস্থিত।
শিল্পীর কাছে মানুষের প্রত্যাশার অন্ত থাকে না। আমিও প্রত্যাশা করব শান্ত-নিসর্গ, নির্মল নীল আকাশ, সবুজ বনরাজি, মুগ্ধ পরিবেশের বাইরে যে-জগৎ সঙ্কট এবং সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠছে, তা-ও যেন প্রতিফলিত হয় শিল্পীর চিত্রে। শীতের রাতে ফুটপাতে ছিন্নমূল মানুষরা যে-উন্মুক্ত নিষ্ঠুর আকাশের নিচে শুয়ে থাকে, দুষ্ট কীটের হুল-দংশনে যে-অবাঞ্চিত আত্মাহুতির অন্ধকারে পাড়ি জমায় অগণিত সীমা, সিমি, মহিমা, ফাহিমা; বুড়িগঙ্গার নোংরা জলে যখন নিশিদিন উবু হয়ে পড়ে থাকে কোনো এক অনামিকা নারীর বীভৎস লাশ, ব্যাপক বোমা-বিস্ফোরণ, সন্ত্রাস প্রভৃতি দুষ্ট-সময়ের বাস্তবতা আর বন্যার জলমগ্নতায় যেসব নরনারী, শিশু প্রতি বছর আশ্রয়চ্যুত হয়ে গাছের ডালে প্লাবিত নদীতে ভেসে যায়, আবার বন্যাশেষে সাহসে বুকবেঁধে নতুন করে ঘর বাঁধে – সেই দুর্যোগের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামের ছবি যেন শিল্পীর চিত্রে স্থান পায়।
অস্কার ওয়াইল্ড বলেছিলেন, ‘কুয়াশাচ্ছন্ন, রহস্যময় লন্ডনের সৌন্দর্য, তার নরনারীর বিচিত্র রূপ, সংগ্রামমুখর দিনরাত্রি, সূর্যাস্তের রক্তরাগ শিল্পী টার্নার তাঁর ছবিতে না দেখালে কেউ লন্ডনের দিকে ফিরেও তাকাত না।’ টার্নারই প্রথম তাঁর ছবির পটে রঙের সমারোহে সেই সৌন্দর্যের জীবন্ত রূপ ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বাংলার মাঠ-ঘাট, আকাশ-বাতাস, বনভূমি এবং পিঙ্গলবর্ণ নরনারীর সংগ্রামমুখর জীবনকে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে আবিষ্কার ও উদ্ঘাটন করেছেন – আমরা শিল্পীদের কাছেও চাইব নতুন বাস্তবতার নিরিখে শিল্পীরা টার্নারের মতো তাঁদের চিত্রে বাংলাদেশকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসবেন।
সাঈদা কামাল তাঁর শান্তির অন্বেষা (১৯৯৫), ফিরে দেখা (১৯৯৬), হেমন্তের রং (১৯৯৯), দূরে কোথাও (২০০১), বুনো ঘাস আর পাথর (২০০১), আমার বসন্ত (২০০৩), প্রতিবেশী (২০০৪), জাগো নারী জাগো (২০০৪), বেদে নৌকা (২০০৪) শিরোনামের বিভিন্ন চিত্রে যে-নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। শিল্পী কখনো এক জায়গায় থেমে থাকেন না। বারবার নিজেকে অতিক্রম করেন। চলে যান দূর-দূরান্তরে। টুলুর আগের ছবির সঙ্গে এবারের ছবি তুলনামূলকভাবে দেখলে অনায়াসে বলা যায়, তিনি অবশ্যই বারবার নিজেকে অতিক্রম করার চেষ্টায় সদা যত্নবান। সাঈদা কামাল টুলুকে আন্তরিক অভিনন্দন।
শিল্পের তৃষ্ণায় অবিরত এগিয়ে যাওয়া একজন সৃষ্টিশীল শিল্পী হিসেবে তাঁর জীবন-উদ্যান আর শৈল্পিক অস্তিত্ব নিত্যনতুন কাজের মাধ্যমে পুষ্পিত এবং পল্লবিত হয়ে উঠুক। এটি কোনো শিল্প-সমালোচনা নয়, একজন আগ্রহী শিল্পানুরাগীর নন্দনতাত্ত্বিক চেতনার উদ্ভাস

