জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

  • হৃত সংগ্রামের গল্প

    হৃত সংগ্রামের গল্প

    কে উ জাতিস্মর নয়। জীবনের সব কথাই সকলের মনে থাকে। তবুও।   এক এই সামনে বসে তাঁকে স্পষ্ট দেখা যাবে না। চেহারায় নানা বর্ণ আছে; বয়স নানা রং দেয়, এখন সেই পোড়া তামাটে রং বিদ্যুতের আলোয় প্রায় বিলীন। একটু পরে পাদপ্রদীপের আলোয়, চাই কি ছুঁড়ে দেয়া আলোয়, সেই রং-ও অদৃশ্য হয়ে যাবে। এ-রকম পোশাকেও নয়।…

  • তৃণাদপি

    তৃণাদপি

    এই গল্পটি আগে একবার বলা হয়েছিল। তবুও আরো একবার শোনা যায়। এক পিতামহ যেদিন গৃহত্যাগ করেছিলেন সেদিন বৃষ্টি ছিল। আমার পিতা আমাকে এই কথা বলেছিলেন। প্রচ- বর্ষণে সেদিন ভেসে যাওয়া মাঠ ও শস্যক্ষিত কেবল সমুদ্রের আভাস দিচ্ছিল। অবশ্য গর্জন ও ঢেউ ছিল না। বৃক্ষরাজিও অমনি ভেসেছিল, জনপদের মতোই এবং বড়ঘরের চালায় বসে কদিন কাটানো যায়…

  • না-স্বপ্ন না-স্মৃতির সারাজীবন

    না-স্বপ্ন না-স্মৃতির সারাজীবন

    এক জানালা দিয়ে তাকালে অনেক দূর অবধি দেখা যায় – দূরের বিমানবন্দর কি বায়ুযানের ওঠানামা। কাচের জানালাঘেরা দশতলার ঘর আমার পদধারীর জন্য। আগে এই ঘরে যার স্থান ছিল, তার জারগায় এখন আমি। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানের – নানা কারণে সকলে সম্মান করে, জানি কেবল পদমর্যাদার জন্যেই নয় – আমার অন্য কিছু পরিচয়ও আছে। তবুও সময়ে সবই…

  • না-স্বপ্ন না-স্মৃতির সারাজীবন

    না-স্বপ্ন না-স্মৃতির সারাজীবন

    এক জানালা দিয়ে তাকালে অনেক দূর অবধি দেখা যায় – দূরের বিমানবন্দর কি বায়ুযানের ওঠানামা। কাচের জানালাঘেরা দশতলার ঘর আমার পদধারীর জন্য। আগে এই ঘরে যার স্থান ছিল, তার জারগায় এখন আমি। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানের – নানা কারণে সকলে সম্মান করে, জানি কেবল পদমর্যাদার জন্যেই নয় – আমার অন্য কিছু পরিচয়ও আছে। তবুও সময়ে সবই…

  • অন্যলোক

    জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ভূলোক   এই চন্দ্রাতপে কোন সুখ আসে না। রাত্রির প্রথম প্রহরে অসংখ্য বিবর্ণ আলো আকাশের কোলে ফুটে থাকে। তখন কেবল ঘষা কাচের গায়ে অতিকায় অট্টালিকার সারি কি দূরে জ্বলে নেভে টাওয়ারের আলো। নিচে আরো দূরে নিশ্চয়ই বৃক্ষরাজি দিনমানে স্পষ্ট; কিন্তু তখন কেবল অন্ধকারের স্তূপ। এবং অকস্মাৎ ছড়ানো হলুদের সহস্র বিন্দু মুছে গেলে ফুটে…

  • স্মৃতিতে নয়, স্বপ্নেও না

    জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত আলো আর অাঁধারের মাঝখানে এক রকম অস্তিত্ব আছে – সেখানে কিছু থাকে না, কিছু ঘটে না, কিছু বোঝা যায় না, কিছু দেখা যায় না। কোনো দৃশ্য নয়। বাইরে তাকালে মুখ ভারি হয়, মন না-বোঝা দুঃখে ভরে যায়। পাশে বসা সহকর্মী জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে, এই রকম সময়ে বড় মন খারাপ করে। দ্রুত…

  • যদি কেউ যায়

    জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত মৃত্যুতে তাঁর ভয় ছিল না। কোনো এককালে শোনা কথা তাঁর কানে বাজতো – ‘ওহে মৃত্যু তুমি মোরে কি দেখাও ভয়, ও ভয়ে কম্পিত নয় আমার হৃদয়।’ কিন্তু ভয় না-করে তাঁর উপায়ও ছিল না। দূর দিগন্তের কোণে লাল রং যে কেবল সূর্যের ডুবে যাওয়া কি উঠে আসা নয় এমন বোধ স্পষ্ট হলে উদ্বেগ গ্রাস…

  • জীবনানন্দের খোঁজে

    জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত বনপথের প্রান্তে যার সঙ্গে দেখা সে যদি আবারো চলে যায় ওই বনপথের গভীরেই, কারো কিছু বলার থাকে না। আমারও ছিল না। শুধু ভাবনা, বরং বলা যাক, সামান্য অস্বস্তি – বনপথে দিশা হারাবেন না তো তিনি? এই সেই বনপথ নয়, বনদেবী এখানে পথ দেখায় না, খেলাও করে না। দেখা যাবে না বনমাঝে কোনো কুমারী…

  • হিমচন্দ্রাতপে

    হিমচন্দ্রাতপে

    বারো ঘর এক উঠানের গল্প জানা আছে। উঠানের চারপাশে বারোটি ঘর, সেখানে বারোরকমের জীবন। কাঠ-পাতা কী কয়লার ধোঁয়ায় উঠান ঢাকা পড়ে, শলার ঝাড়ু হাতে যে যে যার যার অংশের পাতাকুটো পরিষ্কার করে যখন, তখনো ধূলিরাশিতে ঢাকা পড়ে। কিন্তু যা জানা নেই তা হচ্ছে, কখনো এই বারো ঘর থাকে না, এক উঠানও নয়। থাকে না ধোঁয়ার, কী ধূলিকণার রাশি। কালকাসুন্দির ঝোপ কী দণ্ডকলমের ঝাড়, থাকে না বেরাটির বেড়া কী তাতে ঝুলে থাকা তেলাকুচার লতা। সব, এইসব মোহনীয় চাঁদোয়ায় ঢাকা পড়ে, ছলকাতে থাকে হালকা ঢেউয়ের ডগায় রুপালি আলোয়, কোনো এক দিন। উঠানের একপাশে স্নানাগারটি, শৌচাগারও। বারোয়ারি। দেয়াল দিয়ে ঘেরা। তরল বর্জ্য দেয়ালের নিচের সরু পথে বেরিয়ে আসে, নালা দিয়ে বয়ে যায়, ক্রমে সেটি প্রসারিত হয়ে নরম মাটির উঠানের শেষ প্রান্তে এসে একটি ছোট জলাধারই হয় যেন। গাঢ় ছাইয়ের রং ও শ্যাওলার সবুজ জলাধারের মধ্যে মেশে এবং সেখানে বাড়িওলার আফ্রিকী মাগুর মাছটি ক্রমে হাঙরের চেহারা পায়। তবে ওই মাগুরটিও সেদিন থাকে না। চন্দ্রালোকে সে-ও হয় ছায়াহীন এবং ছায়াহীন হয় ঘর এবং উঠানও, কেবল গৃহশীর্ষ ছাড়া। দুই বড় রাস্তার দুপাশে শহরের চেহারা। শহরতলিই প্রায়। তবুও মূল শহরতলি ছাড়িয়ে, বিস্তীর্ণ মাঠ কী ইটভাটার সহস্র চিমনি পেরুলেই জনপদটি পড়ে। সবরকমের দোকানপাট, শহুরে জীবনের চেহারা দেখা যায়। জাতীয় সড়কের পাশেই নানা ব্যবসায়। সোয়েটার কী পোশাক তৈরির কারখানাও বেশ কটি। স্থানীয় কাঠের আসবাবপত্রের দোকানও আছে, ঢালাই লোহার আলমারি কী তারে ছাওয়া তৈজসপত্র রাখবার দেয়ালদানিসহ। অজস্র যানবাহন – দূরপাল্লার বাস, ছোট দৌড়ের মিনিবাস। শিল্পোপকরণ টানবার ট্রাক কী স্বল্পবিত্তের মাল টানাটানির ভ্যানগাড়িতে বাজারে ঢোকার মুখ সর্বদা বন্ধ যেন। সেটি পেরুলে, বাজারের মধ্য দিয়ে যাওয়া রাস্তার দুপাশে দাঁড়ানো থাকে রিকশার দল, এবং তারপর গ্রাম্য-পসারির অস্থায়ী দোকানপাট। কিছু এলোমেলো, অগোছালো স্থাপনার শেষে বাঁয়ে মোড় নিলে মনে হয় যেন জনপদের শেষ Ñ ফলা না-ফলা আম, জাম, কী পীতরাজের বাগান পার হয়ে। আছে বুঝি কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া কী দু-একটি শিমুলও; অসমান ভূমি, কিছু লালমাটির ঢিপি এবং শেষে পরিত্যক্ত ইটখোলার চৌবাচ্চা কী পরিখা। বারো উঠানের কেউ কেউ সেটিকে পুষ্করিণীও ঠাউরে নেয় কখনো। উঠানে যাওয়ার পথ আমবাগানের মধ্য দিয়ে। সরকারি পথ নয়, বেসরকারিও নয়। পায়ে চলার দাগই বলে সেটি পথ। পথের শেষে ইটের দেয়াল টিনের চালের বসতি। সেখানে ডাইনে মোড় নিলে পড়বে ঐ মৎস্যাধার। উলটোদিক থেকে আরেকটি নালা এসে ওই আধারে পড়ে বলে পারাপারের জন্যে ছোট একটি বাঁশের মাচা। সেটি পার হয়ে বাঁয়ে গেলে আবার কিছু ইট-টিনের ছাউনি এবং ঠিক সামনেই সেই চারপাশে বারোঘরের উঠান। উঠানের বাঁয়ে ইট-টিনের নতুন ছাউনি। ইটের দেয়াল দিয়ে ভাগ করা পাঁচটি খোপ, এক একটি ঘর। ঘরের ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় দোচালার টিন। সিলিং নেই Ñ বাঁশের মাচারও। ঘরকটির বাইরে টানা বারান্দা এখনো মাটির। ঘরের মেঝে মাজা সিমেন্টের হলেও, বারান্দা মাটিরই। টিনের চালা দিয়ে ঢেকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও আছে। বারান্দার দূর-মাথায় এক-দুধাপ নামলেই উঠানের শেষ Ñ সেখানে সাজানো পাঁচটি উনুন, মাটিতে গর্ত করে কাদা লেপে বানানো। কাঠকুটো, পাতা কী শুকনো ঘাস জ্বলে সেখানে, যখন যে জ্বালায়। উঠানের শেষ সীমানা বরাবর বাঁশ-কাঠের দোচালা Ñ বাড়িওলার রান্নাঘর। বাঁয়ে সামান্য তফাৎ করে আরো তিনটি বাঁশের বেড়া Ñ টিনের চালের ঘর। কাঠের জানালা বসানো। দিনমজুরের ঘর নয়, বোঝা যায়। বাড়িওলা ও তার দুই ভাই, প্রত্যেকেরই দুটি করে ঘর বলে শৌচাগারের পেছন দিকে ঘুরে এসেছে স্থাপনা। উঠানের বাঁপাশে একটি বেলগাছ, তার নিচে বাঁশের মাচা। রন্ধনক্লান্ত গৃহিণী শরীরের তাপ-নিবারণ কী সতীর্থদের সঙ্গে দিনের সংবাদ-বিনিময়কালে সেখানে বিশ্রাম করেন। কখনো কখনো চাঁদ-তারার রাত্রিতে দীর্ঘকাল ভিড় জমে যেন মাচার ওপরে এবং চারপাশে। উঠানের প্রায় মাঝখানে আছে একটি বাতাবিলেবুর গাছ। আকারে খুবই ছোট তার ফল, তবুও যখন ফলে তেল-মরিচের বাটি নিয়ে অনেকেই যায় তার নিচে। ঘরকটির পেছনে কিছু গাছ আছে। আম-কাঁঠাল হতে পারে। হতে পারে নিষ্ফল পীতরাজ এবং এই গাছের শ্রেণি পেরুলে শুধুই উঁচু-নিচু জমি। পতিত। ফসলের ক্ষেত নয়। ইটখোলার মাটিকাটা খানাখন্দে ভরা। দূরে একটি বাঁশবন। তারপরে ইতস্তত ছড়ানো ইটভাটার চিমনি কখনো আকাশে চোখ তুলতে দেয় না। নীলকালো ধোঁয়ার জন্যে। এই। এই হচ্ছে বারোঘরের উঠান। তিন…

  • গল্পকাহিনী

    বাংলা ছোটগল্পের কলকব্জা কী, অথবা তার নান্দনিক তত্ত্বালোচনা এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। ওই জাতীয় বিদগ্ধ বাক্যস্রোত আমার কলমে আসে না। আমি বরং নিজ গল্প লেখার অভ্যাস সম্পর্কেই কিছু অক্ষর সাজাতে পারি। আমার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়েছিল চল্লিশাধিক বর্ষ পূর্বে। সম্প্রতি প্রকাশিত মদীয় ‘গল্প সমগ্র’র ‘নিবেদন’ অংশে এ-প্রসঙ্গে যা বলা আছে উদ্ধৃত করছি। ‘চল্লিশাধিক বর্ষ’ অনেক…