আবদুশ শাকুর
-
সংগীত ও সমঝদার
আবদুশ শাকুর আমার মতে, ‘শর্তহীন’ সংগীত শব্দটি কেবল মৌলিক সংগীতই বোঝায় – তাকে মার্গসংগীত বলুন, শাস্ত্রীয়সংগীত বলুন, উচ্চাঙ্গসংগীত বলুন, রাগসংগীত বলুন, আর যা-ই বলুন। শৈলীপ্রধান গান, রাগপ্রধান গান, ধর্মপ্রধান গান, রঙ্গপ্রধান গান, লোকগান, পপগান ইত্যাদিকে বলা যায় ‘শর্তযুক্ত’ সংগীত বা যৌগিক সংগীত। এ ধারণার প্রেক্ষিতেই বর্তমান আলোচনাটি চলবে। প্রাচীন কালে দেবমন্দিরে নিবেদিত হতো ধর্মসংগীত। মধ্যযুগের…
-

রবীন্দ্রনাথের মরণদর্শন
আবদুশ শাকুর মৃত্যুদর্শনকে মরণদর্শন লিখলাম, বিষয়টা জীবনদর্শনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিধায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) মরণদর্শন গড়ে ওঠে তাঁর প্রায়-তেইশ বছর বয়সে লোকান্তরিতা নতুন বউঠাকুরাণী কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু (১৮৮৪) থেকে, কবির তেরো বছর দশ মাস বয়সে প্রয়াতা মাতা সারদা দেবীর মৃত্যু (১৮৭৫) থেকে নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনস্মৃতির ‘মৃত্যুশোক’ অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘আমার চব্বিশ বছর (আসলে বাইশ বছর এগারো মাস তেরো দিন) বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে-পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মুত্যৃকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়Ñকিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই।’ রবীন্দ্র-রচনাবলী, খ ১৭, পৃ ৪২৩। তাছাড়া তেতালায় মাতার মৃত্যুর সময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নিচের তালায় নিদ্রিত, বড়ো বউঠাকুরাণী সর্বসুন্দরী দেবীর মৃত্যুর (১৮৭৮) সময় কবি আমেদাবাদে অবস্থান করছিলেন, শিলাইদহে জ্যেষ্ঠ ভগ্নীপতি সারদাপ্রসাদের মৃত্যুর (১৮৮৩) সময় রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় নিজের বিবাহবাসরে। কিন্তু বিয়েটির মাত্র চার মাস দশ দিন পর প্রায়-দুদিনের করুণ সংগ্রামে পরাজিতা (কবি যাঁকে ‘জীবনের ধ্রুবতারা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, সেই) নতুন বৌঠানের মৃত্যু ঘটল, বলতে গেলে, তাঁর চোখের সামনে। রবিজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন, ‘কাদম্বরী দেবীর চিকিৎসা বিষয়ে যে ব্যাপক ও বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় তাতে মনে হয়, সুনয়নী দেবীর বর্ণনা-মতো আফিম-সেবনের ফলে মৃত অবস্থায় তাঁর দেহ আবি®কৃত হয়নি, তাঁর জীবনরক্ষার জন্য বহু ডাক্তার প্রাণপণ চেষ্টা করার সুযোগ পেয়েছেন … ৮ ও ৯ বৈশাখ দুদিন ডাক্তাররা তাঁর জীবন রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সম্ভবত ৯ বৈশাখ [রবি ২০ Apr] রাত্রে বা ১০ বৈশাখ [সোম ২১ অঢ়ৎ] প্রভাতে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।’ রবিজীবনী, খ ২, পৃ ২০৬। অর্থাৎ রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বর্ণিত ও বহুলপ্রচলিত ৮ বৈশাখ ১২৯১ বা ১৯ এপ্রিল ১৮৮৪ তারিখটি তথ্যসমর্থিত নয়। মৃত্যু-তারিখটি নিয়ে বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ এই যে আত্মহত্যাকারিণীর মৃত্যুসংবাদটি কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। সেটা না-হওয়ার কারণ হয়তো ‘নূতন বধূঠাকুরাণীর মৃত্যু হওয়ায় খবরের কাগজে উক্ত সম্বাদ নিবারণ করার জন্য ব্যয় বিঃ ১ বৌচর … ৫২’ (প্রাগুক্ত, পৃ ২০৭)। যাহোক, কাদম্বরী দেবীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়ে সোমেন্দ্রনাথ, দ্বিপেন্দ্রনাথ এবং অরুণেন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথও শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সবিস্তার প্রত্যক্ষ করা এবং তাঁর সর্বসত্তাকে নাড়া দেওয়া এই মৃত্যুটি থেকে পাওয়া প্রথম শোক অপরিশ্রুত রূপ পরিগ্রহ করে ‘পুষ্পাঞ্জলি’ শীর্ষক সমসাময়িক রচনায় (র-র, খ ১৭, পৃ ৪৮৬-৯৬)। কাদম্বরী দেবীর স্মৃতি-সুরভিত এই সব অনুচ্ছেদ,…
-

কলের গানের গল্প
স নাতন ধর্ম বলে নাদই ব্রহ্ম : জগজ্জীবন শুরু হয়েছে শব্দে, শেষও হবে শব্দে। মানুষও জন্মমাত্র শব্দই করে প্রথমে। অথচ শব্দধারণ করতে শিখেছে সে মাত্র শতাধিক বছর পূর্বে। তাই সার্ধশতাধিক বছর আগের নিধুবাবু-দাশুরায়দের গাওয়া গান আমরা তাঁদের কণ্ঠস্বরে শুনতে পাই না। কিন্তু বহুশত বছর আগের লেখকদের লেখা আমরা তাঁদের হস্তলিপিতে পড়তে পাই। কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেনের…
-

সেতারের খেয়ালিয়া উস্তাদ বিলায়েত খাঁ
যুগান্তকারী সেতারি বিলায়েত খাঁ প্রায় দুদশক আগে আমেরিকার নিউ জার্সিতে চলে গিয়েছিলেন। তবে কোনো জনপ্রিয় কিংবা মিডিয়া-মাতানো কর্মসূচি নিয়ে নয়। শোম্যানশিপের মেজাজও তাঁর ছিল না। ইউনিভার্সিটি টাউন প্রিন্সটনে বিলায়েতের সেতারবাজের বিশাল আর্কাইভ তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাংলার সঙ্গে, বিশেষত কলকাতার সঙ্গে, তাঁর সম্পর্কের গভীরতায় ভাটা পড়েনি কখনো। প্রায়ই আসতেন, বিশেষত শীতকালে (শেষের দিকে গরম সইতে পারতেন…
