যুবকবয়সে রবীন্দ্রনাথ পদ্মার পাড়ে দাঁড়াতেন, দেখতেন নিসর্গের বিস্তৃতি; পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে খোয়াইর পাড়ে দাঁড়াতেন, দেখতেন নিসর্গের রুক্ষ-কঠিন শ্রী  এবং দুক্ষেত্রেই ভাবতেন মানুষ প্রকৃতির বদলে কী তৈরি করেছে – এই ভাবনা তাঁর মধ্যে একটি অপ্রিয় বোধ জাগাত। এই বদল, বদলে দেওয়া তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। এই বিচার থেকে তিনি কখনো সরে যাননি। পদ্মার পাড়ে তাঁর ‘নির্বাসিত’ জীবনযাপনে কিংবা    শান্তিনিকেতনে তাঁর ‘নির্বাসিত’ জীবনযাপনে এই বোধ তিনি চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করেছেন। এই অনুভব এবং এই নির্বাসনে তিনি একা, কিন্তু শিল্পী বলেই তাঁর বিচারকে তিনি একটি একক অনন্যতা দিয়েছেন। একটি মোহ তাঁর মধ্যে তৈরি করেছে আবেশ এবং একটি মোহমুক্তি তাঁর মধ্যে তৈরি করেছে ক্রোধ। রবীন্দ্রনাথের স্টাইল এই মোহ এবং মোহমুক্তির দ্বন্দ্ব থেকে, মোহ এবং মোহমুক্তির গভীর ও অনুপুঙ্খতা থেকে বেড়ে উঠেছে। যে-মানুষ বিশ্বাসী এবং যার বিশ্বাসে শিশুর সারল্য, যিনি অনবরত জীবনের স্বপ্নে তাড়িত, তাঁর পক্ষেই সম্ভব তাঁর মধ্যে আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠা ক্রোধ ও মোহমুক্তিকে শিল্প করে তোলা। জীবনের প্রতি প্রেম রবীন্দ্রনাথের জীবন-বিচারকেই উন্মোচিত করে। তাঁর গদ্যের করতলের মধ্যে, অনুচ্ছেদ ও পাঠকের মধ্যে, প্রায়শই বাজে জলস্রোতের শব্দ, গাছপালার মধ্য থেকে বাতাস, কোনো একটি পরিচ্ছন্ন ও পরিশীলিত ভুবন থেকে ভেসে আসে। এই বাতাস, এই জলস্রোত তাঁর অনেক গদ্যের শবগন্ধ সহ্য করতে শেখায়। এই বাতাস, এই জলস্রোত নিশ্চিতভাবেই একটি উচ্চস্তর থেকে উচ্ছ্রিত, আমাদের সামনে মেলে ধরা। তাঁর মতো সংকল্পবান নীতিবিদ বাংলাসাহিত্যে কম। একটি সু-জীবনের স্বপ্ন তাড়িত করে ফেরে কু-জীবনকে (তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোতে তা-ই ঘটেছে বারবার), তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন এসব, তিনি ক্রোধ একপাশে সরিয়ে (ঘরেবাইরের সন্দীপ কিংবা যোগাযোগের মধুসূদনের কথা কি মনে পড়ে না), তিনি সু-জীবনের স্বপ্নের মধ্যে আমাদের ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করতেই থাকেন। তাঁর সংগতির কথা যখন আমরা ভাবি, সেই শিল্পীর কথা যিনি বদলান না কিংবা বদল দরকার মনে করেন না, তখন আমরা গ্রন্থকারকে দেখি, একই সঙ্গে পাঠককে, দুজনেই মোহাবিষ্ট একটি স্টাইলের চাপে। এই স্টাইল তাঁকে যতটুকু পর্যন্ত ভাববার অনুমতি দিয়েছে, অনুভব করতে দিয়েছে, বলবার অধিকার দিয়েছে ততটুকু পর্যন্ত তিনি গিয়েছেন (চোখের বালিতে বিধবার প্রেম তিনি পছন্দ করেননি)।

এই স্টাইল, পরিস্রুত জলশব্দের মতো তাঁর শ্রেষ্ঠ গদ্য ও সেরা উপন্যাসগুলোর হৃৎপিণ্ডে বয়ে যায়, শব্দের আবেশ থেকে আমরা পৌঁছে যাই শব্দভঙ্গের দিকে। তাঁর গদ্যের ঢালের পেছন থেকে, তাঁর নির্বাসনের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে একজন স্বাপ্নিক, যিনি ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিককার ইংরেজি সাহিত্যের সুপাঠক, যিনি বাংলা সাহিত্যের বিপজ্জনক বুদ্ধিবাদী অরণ্যে নিজের শক্তিতে বহুদূর পর্যন্ত কর্ষণ করেছেন। স্বপ্নটিকে তিনি অপরিবর্তিত রেখেছেন, তিনি নিজের জমির সীমানা বাড়িয়েছেন, স্টাইলের দিক থেকে তিনি নিজের সীমানার বাইরে পা ফেলতে রাজি হননি।

এ-ধরনের লেখক-সম্বন্ধে মূল্যায়ন এবং পুনর্মূল্যায়ন কখনো শেষ হয় না। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই, মানুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ এবং লেখক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ, ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠেছেন। তিনি, এখন স্পষ্ট হচ্ছে, অনেক মানুষ, একজন দুজন রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচিত বইগুলোর স্টাইলের মধ্যে ধরা পড়ে। এই লোকটি স্বনির্ভর, লেখক হিসেবে আত্মবিশ্বাসী, খুব শক্তমনা ব্যক্তি। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি অনুপস্থিত।

তিনি পরিশীলনের দিকে অগ্রসর হয়েছেন, পুনরাবৃত্তির দিকে নয়। একজন বুলফাইটার তার লাল কাপড় মেলে ধরে যেমন তার শক্তি পরীক্ষা করে, তেমনি রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিষয় বাছাই করেছেন তাঁর স্টাইলের দিক থেকে। শেষের কবিতার কথা উল্লেখ করা যায় কিংবা চার অধ্যায় কিংবা মালঞ্চ কিংবা দুইবোন। লেখকের নয়, বরং এখন থেকে স্টাইলের কাজ হচ্ছে দৃশ্য বাছাই করা, লব-কুশ নির্বাচন করা এবং ঠিকঠাক শব্দে কথা বলা। সূক্ষ্ম কারুকাজ স্টাইলের মধ্যে যুক্ত, বিষয়ের মধ্যে নয়। এসব উপন্যাসে বিষয় : নির্ভার। রবীন্দ্রনাথ জানেন এসব চরিত্র ভিন্ন, একেবারে ভিন্ন। কিন্তু এসব চরিত্রের মানুষ সাদাসিধা, জটিল নয়, যদি তুলনা করা যায় গোরা কিংবা ঘরেবাইরে কিংবা যোগাযোগ কিংবা চতুরঙ্গের সঙ্গে। মানুষগুলোর আবির্ভাব সাদাসিধা, যাতে প্রকৃতি উদ্ভূত হয় জটিল বলে। প্রকৃতির উজ্জীবন (শেষের কবিতা কিংবা চার অধ্যায় কিংবা মালঞ্চ কিংবা দুইবোন) মনে হয় স্বর্গ থেকে পতনের মতো, মানুষকে হ্রস্ব করে তিনি প্রকৃতির মাধ্যমে বার্তা প্রেরণ করেছেন।

সিংহ যেমন নিজের বাঁচার জন্য একটি আইন তৈরি করে, তেমনি রবীন্দ্রনাথও নিজের জন্য একটি আইন তৈরি করেছেন। তাঁর সমকালের কবি ও লেখকরা নিজেদের খাপ খাইয়েছেন সাহিত্যের সঙ্গে। একমাত্র তিনি সাহিত্যকে খাপ খাইয়েছেন নিজের সঙ্গে। তিনি অনুগত হননি সমকালের সমালোচনার কাছে। যত তাঁর সমকালের লেখকরা সাহিত্যের কাছে নিজেদের অনুগত করেছেন, তত তিনি সাহিত্যকে তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের কাছে নির্ভরশীল করেছেন। তাঁর সময়ে প্রতিভা শব্দ অতি-প্রাকৃত শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত, বদলে তিনি সাহিত্যক্ষেত্রে ক্ষমতার বোধ ও পরিশ্রমের বোধ এনেছেন। পরিশ্রম থেকেই সাহিত্যে তৈরি হয় ক্ষমতা। এই ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব সাহিত্যক্ষেত্রে, সেখানে কোনো প্রতিযোগী নেই। তিনি জিতে নিয়েছেন তাঁর সমকালের লেখকদের তাঁর ক্ষমতার কর্তৃত্ব দিয়ে। নোবেল পুরস্কার সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর কর্তৃত্বের বোধ বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে। এই কর্তৃত্ব দিয়ে তিনি পৃথিবীর এবং ইতিহাসের ও সভ্যতার জটিলতা বোঝার চেষ্টা করেছেন, সেই সঙ্গে তৈরি করেছেন মানানসই ক্রাফট, ডিসিপ্লিনড আবেগ, ডিসিপ্লিনড শব্দ। তিনি জীবৎকালে হয়ে ওঠেন কিংবদন্তির মানুষ এবং কিংবদন্তির লেখক। যত তাঁর বয়স বেড়েছে, বয়স বাড়ার দিক থেকে সবকিছু প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু বয়স বাড়ার দিক থেকে জবাব পাননি এবং তাঁর জবাবহীন প্রশ্নগুলোকে তিনি স্টাইল দিয়েছেন। আমরা তাঁর জীবন থেকে, তাঁর শিল্প থেকে শিখেছি। কিন্তু তিনি কী করে সর্বনাশ ঠেকাতে হয়, সাহস রক্ষা করতে হয়, ক্ষমতা শক্তিশালী করতে হয়, আমাদের, পাঠকদের শেখাতে পারেননি। এসব শেখানো যায় না। এসব অনিবার্য। এই বোধটিই আমাদের মনে জাগে     যখন ঘরেবাইরে কিংবা যোগাযোগ পড়ি। এ-দুটি উপন্যাস সযত্নে পরিকল্পিত; ঘরেবাইরে-তে নিখিলেশ, বিমলা এবং সন্দীপ, যোগাযোগে মধুসূদন এবং কুমু নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই ডেকে এনেছে। সর্বনাশের মুখোমুখি হয়ে বাঁচা যায় না, তখন অনিবার্য ধ্বংস। নিখিলেশ, বিমলা, সন্দীপ, মধুসূদন, কুমু সবাই স্বনির্ভর এবং স্বনির্ভরতা থেকে তৈরি হয় সর্বনাশের সম্মুখীন হয়ে এক ধরনের নির্বাসন। এই নির্বাসন নিজেদের চূড়ান্তে পৌঁছে দেয়, কিন্তু বাঁচাতে পারে না। এক হিসেবে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন রবীন্দ্রনাথ এসব ক্ষেত্রে। আহত সিংহ এবং সিংহীরা গর্জন করতে পারে না। তারা কাতরায়। তিনি বলতে চান, প্রকৃতি ভালো আর মানুষ নিজের জন্য তৈরি করেছে জঞ্জাল। এসব কাজে মানুষ এবং মানুষীরা নেহাৎ কাতরায়, গর্জন করতে পারে না। আহত সিংহ এবং সিংহীরা অন্যের সহানুভূতি ও আবেগের বিষয়ে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ তাদের সর্বনাশের পাড়ে পৌঁছে দেন, কিন্তু বাঁচাতে পারেন না।

রবীন্দ্রনাথের সময়ে ঔপনিবেশিক শোষণ ও ধনতান্ত্রিক শোষণ যত বেড়েছে ততই বাঙালি জাতীয়তাবাদের (কিংবা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের) ক্ষেত্রে জাতীয় সংস্কৃতির ঐক্য ও শুদ্ধতা রক্ষা করার চেষ্টা বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে দেখা দিয়েছে। এসবের মধ্যে যুক্ত পরস্পরবিরোধী নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারের বোধ, অর্থ ও অধ্যাত্মবাদ, বিনিময়-মূল্য ও চূড়ান্ত মূল্য। বুদ্ধিজীবীরা, সেই সময়ে সক্রিয়ভাবে রাজনীতির বিভিন্ন ফর্মের সংস্পর্শে এসেছেন, যেসব ফর্ম সমাজজীবন থেকে বেঁচে থাকার মূল্য ও উদ্দেশ্য নিংড়ে নিয়েছে, তারপর তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ভয়ে ও আতঙ্কে তাদের সৃষ্ট বিপর্যস্ত সমাজ-নিসর্গ থেকে এবং চূড়ান্ত মূল্যবোধ হারানোর বিলাপে চতুর্দিক ভরে তুলেছে। ঘরেবাইরে, চতুরঙ্গ, যোগাযোগের এ-ধরনের একটি পাঠ সম্ভব।

যা ঘটেছে তা হচ্ছে, বঙ্গীয় সংস্কৃতির পক্ষে সমীকরণের সামাজিক ভূমিকা পালন করা সম্ভব হচ্ছিল না। যতক্ষণ পর্যন্ত এ-ধরনের সংস্কৃতি-ভাবনা চেষ্টা করেছে সামাজিক সমস্যা নিরসন করার : যেমন, অধ্যাত্মবোধ, ধর্মসংস্কার, নারীশিক্ষার প্রসার, বিধবা-বিবাহ- প্রচলন, মদ্যপান-নিবারণ, ততক্ষণ পর্যন্ত উচ্চতর সমন্বয়ের প্রজেক্ট হিসেবে সংস্কৃতির কনসেপ্ট জাগতিক জঞ্জাল দূর করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সময় থেকেই সমাধানের বদলে সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে সমস্যার অংশ; দূর হিমালয়-শিখরের বদলে এক যুদ্ধক্ষেত্র। সংস্কৃতির ঐতিহ্যবহ কনসেপ্টের পক্ষে রাজনীতির অ্যাজেন্ডা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না, রাজনীতির অ্যাজেন্ডায় সে-সময় দেখা দিয়েছে এথনিক (ইংরেজ বনাম বাঙালি/ভারতীয়, হিন্দু বনাম মুসলমান), যৌনজ (নারী বনাম পুরুষ, বাণিজ্যিক পুরুষ বনাম জমিদারির আয়েশে লালিত স্ত্রী, নিয়মতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ বনাম সশস্ত্র জাতীয়তাবাদ); এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবার ভাষার সমস্যা (ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত), মূল্যবোধের সমস্যা (পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ এবং বাঙালি/ভারতীয় মূল্যবোধ), স্মারকের সমস্যা (ইংরেজি সভ্যতায় শিক্ষিত স্মারক এবং কৃষিজীবী সংস্কৃতির স্মারক), এবং অভিজ্ঞতার সমস্যা (বিশাল বিশ্ব এবং বিচ্ছিন্ন বাংলা/ভারত)। স্বদেশী আন্দোলন, অসহযোগ-খেলাফত আন্দোলন, সোভিয়েত বিপ্লব, কেমালিস্ট বিপ্লব স্পষ্ট করেছে সংস্কৃতি ক্ষমতা থেকে দূরে অবস্থিত কোনো তাত্ত্বিক শুদ্ধতা এবং সরলতা নয়, বরং বিপরীত। মধুসূদন এবং রবীন্দ্রনাথের মধ্যবর্তীকালে (নজরুল এই কালের  অন্তর্ভুক্ত) কাব্যিকতা এবং রাজনৈতিকতা, নান্দনিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিকতার গঠন বিপুলভাবে বদলে গেছে।

সংস্কৃতির পক্ষ থেকে সাহিত্য এবং সাহিত্য-সমালোচনা এই ঐতিহাসিক ইমারজেন্সিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সংস্কৃতির অন্যান্য ক্ষেত্র, যেমন, দর্শন কিংবা ইতিহাস এই দায়িত্ব পালন করেনি বলে সংস্কৃতির সম্মুখভাগ সাহিত্য দখল করেছে। সত্য এবং ন্যায়, স্বাধীনতা এবং সুখ : এসব স্পেকুলেটিভ প্রশ্নের জন্য একটি বাসা দরকার। এই বাসাটি, রবীন্দ্রনাথের সময়ে সাহিত্য যুগিয়েছে। নষ্টনীড়, ঘরেবাইরে, চতুরঙ্গ – এসব বই যদি এভাবে পড়ি তাহলে, বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশাল পরিসরের ঝগড়া, বিবাদ, দ্বন্দ্ব, বৈপরীত্যের খোঁজ পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়ের সাহিত্য সহ্য করেছেন মাত্র। সহ্য করেছেন এই অর্থে : তিনি উত্তরাধিকার-সূত্রে লাভ করেছেন কিন্তু ব্যবহার করেননি। যেমন, ভাষা, বিষয়, বোধ Ñ সাহিত্য করার সবচেয়ে বিপজ্জনক মালমশলা। তিনি বিদ্যাসাগরের দিকে একবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়েছেন, তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের দিকে একবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়েছেন, তাঁরা তাঁর কাছে রেটরিক ও মতাদর্শের প্রতিনিধি; তাঁরা বিভিন্ন বোধ, অনুভব, বাঙময়তা, দৃষ্টির মধ্যকার সংঘাত, বিবাদ, বৈরিতার খোঁজ নেননি। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের সন্দেহ করে নিজের কাজ করেছেন, অগ্রসর হয়েছেন ধীরে, সেজন্য তাঁদের থেকে তাঁর প্রথমদিককার দূরত্ব অস্পষ্ট, তিনি আস্তে আস্তে তাঁর বোধের বিভিন্ন ব্যবহার, অনুভবের বিভিন্নতা, সৃষ্টির নানামুখিতা দিয়ে উত্তরাধিকারকে সমালোচনামনস্ক উত্তরাধিকারে বদলে দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বিত্তবান, শিক্ষিত, পেশাজীবী এবং কৃষির উদ্বৃত্তের ওপর নির্ভরশীল মধ্যশ্রেণি গড়ে উঠেছে। এই মধ্যশ্রেণি লড়াই শুরু করে দিয়েছে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আধিপত্য-বিস্তারের। একটি সমাজশ্রেণি থেকে উত্থিত মানুষগুলো নিজেদের শ্রেণি-স্মারক ও স্ব-স্মারক রক্ষা করার লড়াইতে মগ্ন। নিখিলেশের মধ্যে কাজ করছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-উৎসারিত কৃষি-কাঠামোর স্বার্থবোধ বনাম ইংরেজি শিক্ষা, পাশ্চাত্য- সভ্যতানির্মিত স্বদেশীয়ানা, এভাবে যদি দেখি তাহলে তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর চরিত্ররা একই সঙ্গে আইডিয়া, আইডিয়েল এবং মতাদর্শিক প্রতিনিধি; একই শ্রেণির বিভিন্ন দিক হচ্ছে নিখিলেশ এবং সন্দীপ এবং বিমলা; লাবণ্য এবং মধুসূদন; তাদের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির উত্তরাধিকারের নির্বাচিত ক্রিটিক চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়েছে।

আবার চাঁদের উলটো পিঠের মতো, অন্যদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের কাজ বিচার করা যায়। তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোতে (গোরা, ঘরেবাইরে, যোগাযোগ, চতুরঙ্গ, চার অধ্যায়) অন্তঃশীল ইংরেজ (ইউরোপিয়ান) এবং বাঙালি (ভারতীয়) সম্পর্ক। এই ইংরেজ কলোনিয়াল ইরেজ, উচ্চতর সভ্যতার প্রতিনিধি এবং এই বাঙালি (হিন্দু ভদ্রলোক বাঙালি) অধস্তন, একই সঙ্গে ইংরেজের (ব্যক্তিগতভাবে এবং উচ্চতর সভ্যতার প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে) প্রতিযোগী। বিভিন্ন উপন্যাসে বিভিন্ন ঘটনায় বিম্বিত দু-ধরনের মানুষের (ইংরেজ এবং বাঙালির) মধ্যকার প্রতিতুলনা। রবীন্দ্রনাথ ইউরোপিয়ান সভ্যতাকে মতাদর্শ হিসেবে ভেবেছেন এবং ইউরোপিয়ান সভ্যতাকে কাহিনীসূত্রে অন্তঃশীল টেকনিক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন ঘটনা, আখ্যান, কাহিনীর, কখনো ট্র্যাজিক, কখনো ট্র্যাজি-কমেডিক নৈতিকতা নিয়ে, যেখানে ব্যক্তি সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য নিজের ভূমিকা প্রস্তুত করে। রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নটি হচ্ছে ভূমিকার বাস্তবতা নিয়ে, যেক্ষেত্রে ব্যক্তি প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে লিপ্ত করে। এই লিপ্ততা হচ্ছে অন্যের সম্পর্কের দিক থেকে নিজেকে তৈরি করে নেওয়া। এভাবে আখ্যানের মধ্যে তৈরি হতে থাকে আত্মচেতনার অন্তরঙ্গ গভীরতা। সেজন্য আখ্যান হচ্ছে ঘটনাগতি ও আত্মচেতনার সম্পর্ক। তাঁর উপন্যাসগুলোতে বাস্তবতার মায়াভাসের গুরুত্ব নেই কিংবা ক্ষীণ, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আখ্যানের প্রাথমিক দিককার সত্য এবং যুক্তি, যেসব চূড়ান্ত পরিণতির দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠেলে দিয়েছেন। উপন্যাস হচ্ছে, মনে হয়, মাধ্যম, যার মধ্য দিয়ে ‘অভিশপ্ত’ রবীন্দ্রনাথ মোক্ষ অর্জন করেছেন। বিভিন্ন উপন্যাসে তাঁর জীবনী কিংবা ছদ্মবেশী জীবনীর খোঁজ মেলে। (এই অন্য রবীন্দ্রনাথকে খুঁজেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই সময় দুই খণ্ড উপন্যাসে)। কিন্তু কীসের থেকে মোক্ষ? বাস্তবের পাঁক থেকে, প্রকৃত অভিজ্ঞতার মগ্নতা থেকে, তাঁর নিজের জীবনীর উচ্ছন্ন অংশ থেকে, অন্যদের গঞ্জনা ও নিন্দা থেকে, সন্ত হওয়ার যন্ত্রণা থেকে, পাপের মধ্যে বাস করার অনিবার্যতা থেকে। এই সবকিছু থেকে তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর কল্পনাকুশল স্বাধীনতা। বাস্তবজীবনে যে-কনফেশন তিনি করতে পারেননি (জীবনস্মৃতিতে তিনি অনুপস্থিত, এই অনুপস্থিত হওয়া ইচ্ছাকৃত), সেই কনফেশন তিনি করেছেন বিভিন্ন উপন্যাসে। উপন্যাসগুলো তাঁকে খোলামেলা করেছে স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীর কাছে, অন্যদের কাছে এবং পাঠকদের ভালোবাসার কাছে। তিনি নিজের জীবনীর দুঃস্বপ্ন থেকে নিজেকে অথেনটিকভাবে উপস্থাপিত করেছেন অন্যদের সম্পর্কে ছদ্মবেশের মধ্য দিয়ে। মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ সার্থকভাবে নিজেকে ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন উপন্যাসে। একদিকে পাপ অন্যদিকে ভণ্ডামির মধ্যে যে-মানুষটি বড়ো হয়, সেই মানুষটিকে তিনি নিজের মধ্যে খোঁজ করেছেন সঠিক জবাব দেওয়ার জন্য। পাপ এবং ভণ্ডামি স্বাভাবিক, তিনি নিজের মধ্যে এই স্বাভাবিকতা অনুভব করেছেন, একই সঙ্গে অন্যায় বিচারের শিকার হওয়াকে নিজের মধ্যে অনুভব করেছেন ভান করেছেন, ইনোসেন্ট হতে এবং ইনোসেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি শুভবোধ ও পাপবোধ থেকে পালাতে চেয়েছেন। সেজন্যই কি তাঁর উপন্যাসগুলো ট্র্যাজিক?